বাঁম পায়ে স্বপ্নপূরণ
বাঁম পা কে সঙ্গী করে এক স্বপ্নছোয়াঁ অদম্য ও অপরাজেয় নারী তামান্নার জীবন যুদ্ধে হার না মানার গল্প
প্রতিবন্ধকতাকে তর্জনী দেখিয়ে এই বছরের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় বারের মতো হয়ে যাওয়া গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় তামান্না আক্তার নুরা গুচ্ছভুক্ত ২২টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় তামান্না আক্তার নুরা উত্তীর্ণ হয়েছেন ।
''তামান্না আক্তার নুরা'' ২০০৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর তামান্নার জন্ম। দুই হাত ও এক পা ছাড়াই মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে আসেন তামান্না। জন্মের পর মা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েকে আগলে রেখেছেন নিজের বুকে। বোঝা হতে দেননি কারও। ছোটবেলায় মেয়ের পায়ে কাঠি দিয়ে লেখানোর চেষ্টা করতেন মা খাদিজা। এরপর বাঁকড়া আজমাইন এডাস স্কুলে ভর্তি করানো হয়। মাত্র দুই মাসেই পা দিয়ে লিখতে শুরু করেন; শেখেন ছবি আঁকাও। ২০১৩ সালে পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পান। একইসঙ্গে পান বৃত্তিও। এরপর ভর্তি হন বাঁকড়া জনাব আলী খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে জেএসসিতেও জিপিএ-৫ পান।
তামান্নার জন্ম হতে এখন অব্দি চলার পথ কখনো মসৃণ ছিল না। সেই মসৃণতার
স্বাভাবিকভাবে হয়নি কারণ তার আশেপাশের পাড়া-প্রতিবেশী, আত্নীয়-স্বজন তাকে এই বলে টিপ্পনী কাটত যে, “অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মা মুরগি কেটেছে না হলে মাছ কেটেছে। তা না হলে অনেক পাপ করেছে। এজন্য মেয়ে প্রতিবন্ধী হয়েছে”এরকম অসংখ্য় বাজে মন্তব্য তার আর তার মার দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিল।
এমনকি তার স্কুলে পর্যন্ত তাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম ভর্তির ক্ষেত্রে অনেক কটু কথা হজম করতে হয়েছে । তবুও তামান্না দমে যাইনি। তার পাহাড়সম দৃঢ়তায় ও অটল মনোবল নিয়ে একমাত্র বাম পাকে সঙ্গী করে এবং পাড়া-মহল্লার প্রতিবেশী, আত্নীয় -স্বজন তার প্রথম দিকের শিক্ষাস্থান যেখানে তার শিক্ষক ও সহপাঠীদের তিরস্কার মাথায় নিয়ে সে হয়েছে এই সবও তার সবসময় তাকে প্রেরণা যুগিয়েছে দেখিয়ে দেবার সবাইকে । আজ সে পিএসসি,জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় রীতিমত কাঁপিয়ে দিয়েছে তার ক্ষুরধার মেধা-মনোবল ও বাম পায়ের কলমের আচঁড়ে আছড়ে ফেলে দিয়েছে তাকে নিয়ে যে কুয়ার ব্যাঙগুলো সর্বদা তাদের শতশত প্রতিবন্ধি বলে খোঁটা দেওয়ার, অন্য দশটা বাচ্চার মতো তাকেও বিশিষ্ট প্রাণীসমাজের মেনে নিতে না পারা ; তাকে আর তার মা-বাবাকে তথা পুরো পরিবারকে একঘরে করে দেওয়া, তা আত্নীয়-স্বজনের কোন অনুষ্ঠানে তাদেরকে না ডাকা , কথিত করিম-রহিম চাচার চায়ের আড্ডায় অথবা পাড়া-মহল্লায় তাকে ঘিরে নানারকম হাস্যরসাত্নক কথাচর্চা ইত্যাদি তাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।
সেলুট সেই রত্নগর্ভা মাকে যিনি তামান্না আক্তার নুরা বোনের মতো একজন অকুতোভয়ী ও প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পা ফেলার জন্য সাহস ও প্রেরণা যুগিয়ে গিয়েছেন সবসময় এবং ধন্য তার শিক্ষক বাবা যার কষ্টার্জিত পরিশ্রমে তার বাবার তিল তিল করে গড়ে তোলা মাথার উপরে তুলে ধরা ছাদকে একটুকুও মরিচা পড়তে দেননি; মরিচা পড়তে দেননি তার বাবা রওশন আলী ও মাতা খাদিজা পারভীনের লালিত স্বপ্ন ও শত বাধা-বিপত্তি , শিক্ষিত শিকড়ে আবৃত অশিক্ষিত সমাজের তথাকথিত অভিভাবকদের তাকে নিয়ে হওয়া শতশত চুলকানিকে উপেক্ষা করে তার জন্য স্বপ্নতরীর কূল ঠিক করতে একটুকুও পিছপা হননি; শুকিয়ে যেতে দেননি তাদের চোখের কোন এক কোনের স্বপ্নের রংধনুর দিয়ে আঁকা ক্যানভাসের রং।
সেই মা-বাবাকে আমাদের অন্তরের অন্তরস্থল থেকে ধন্যবাদ ও অনন্তকোটি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
সেই সাথে তামান্নাকে সরকারী পৃষ্ঠপোষকদের, বিত্তবান ,সমাজসেবী ও মানবতাবাদীদের এগিয়ে আসার অনুরোধ করছি তার স্বপ্নপূরণের অংশীদার হওয়া এবং তাকে ও তার মতো এইরকম সুবিধাবঞ্চিত মেধাবীদের দেশে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ব্যক্তিদের তাদের প্রতিভা উন্মোচিত ও বিকশিত করার সুযোগ দানে সবরকম সাহায্য করার অনেক অনেক অনুরোধ করছি। ধন্যবাদ।

Comments
Post a Comment